চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে অতি প্রত্যাশিত ‘নতুন ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা চুক্তি’ অনুমোদন করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭টি দেশের নেতারা। তারা আশা করছেন, চুক্তিটি এ ব্লকের অর্থনৈতিক স্থবিরতা দূর করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে বাড়তে থাকা ব্যবধান কমাতে সাহায্য করবে। তবে বুদাপেস্টে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এ শীর্ষ সম্মেলন থেকে যৌথ ঋণ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। খবর ইউরো নিউজ।
শিল্পায়নের গতিতে ক্রমে হ্রাস ও বিপর্যস্ত অর্থনীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় সম্মেলনে। যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুত শুল্ক বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতি কতটা খারাপ হতে পারে তাও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অর্থনৈতিক স্থবিরতা দূর করতে প্রতিযোগিতা চুক্তিতে কিছু পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রাধান্য পেয়েছে ইইউর একক বাজারের দৃঢ়তা বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) ও স্টার্টআপের জন্য নতুন নগদপ্রবাহ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, দেশীয় হাই-টেক শিল্পকে উৎসাহ দান, টেকসই বাণিজ্য চুক্তি এবং দশকের শেষ নাগাদ গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) খাতে জিডিপির অন্তত ৩ শতাংশ ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি।
বিস্তৃত এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় নেবে। ব্লকের ডানপন্থী নেতারা অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য ‘গ্রিন ডিল’ বা পরিবেশবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার কমানোর প্রস্তাব দিলেও তা গ্রাহ্য হচ্ছে না। সম্মেলনের যৌথ ঘোষণা অনুযায়ী, নেতারা ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু নিরপেক্ষতা অর্জন এবং ব্লকের জ্বালানি লক্ষ্য থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি অপসারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তারা বলেন, ‘আমাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগীদের ও ইইউর মধ্যে উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতায় বিদ্যমান ব্যবধান দ্রুত দূর করা জরুরি। সব ইইউ নাগরিক, ব্যবসা ও সদস্য রাষ্ট্রের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করব আমরা।’
চুক্তিটি ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিও দ্রাঘির আলোচিত এক প্রতিবেদনের সরাসরি প্রতিক্রিয়া। যেখানে তিনি জানিয়েছিলেন, ইউরোপ যদি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও শিল্পে আধুনিকীকরণে দ্রুত পদক্ষেপ না নেয় তবে অঞ্চলটির অর্থনীতি ‘ধীরে ধীরে পতনের’ দিকে এগিয়ে যাবে। তবে ইইউর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দ্রাঘির গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ যৌথ ঋণ গৃহীত হয়নি।
ইতালীয় এ অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ইউরোপে প্রতি বছর ৮০ হাজার কোটি ইউরো পর্যন্ত অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। অর্থের পরিমাণ বড় হলেও ব্লকের সামনে এর কোনো বিকল্প নেই। তাই কভিড-১৯ মহামারী সময়কালের মতো যৌথ ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা যেতে পারে।
গত শুক্রবারের শীর্ষ সম্মেলনে মারিও দ্রাঘি অংশ নিয়েছিলেন। তিনি এও জানান, যৌথ ঋণের বিষয়টি অবশ্যই ‘প্রথম কাজ’ হবে এমন নয়, তবে এ পদক্ষেপ ‘অপরিহার্য’। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি না করতে ইইউর সদস্য দেশগুলোকে তাগাদা দেন তিনি। মারিও দ্রাঘি বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়েছে। কারণ আমরা ঐকমত্য আশা করেছিলাম। ঐকমত্য আসেনি, কিন্তু এসেছে কম উন্নয়ন, কম প্রবৃদ্ধি এবং এখন স্থবিরতা।’
‘ঐক্যবদ্ধ মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যদি এলোমেলোভাবে চলতে থাকি, আমরা আকারে খুব ছোট হয়ে যাব এবং কোথাও পৌঁছতে পারব না।’
এমন এক সময় এ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ ইউরোপের জন্য কিছু গুরুতর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এনে দিতে পারে, যা ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে (ইসিবি) সুদহার দ্রুত কমানোর দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং কমিয়ে দিতে পারে ইউরোজোনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির।
অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রে রফতানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইইউ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ হাজার ২৩০ কোটি ইউরো মূল্যের পণ্য রফতানি হয়েছে, যার মধ্যে ছিল প্রায় ২০ হাজার ৭৬০ কোটি ইউরোর যন্ত্রপাতি ও যানবাহন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুল্ক বাস্তবায়ন হলে ইউরোপের অর্থনৈতিক আউটপুট বিদ্যমান জিডিপির হিসেবে দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে, যার মধ্যে জার্মানিতে দশমিক ৬ শতাংশ সংকোচন এবং ইতালিতে দশমিক ৩ শতাংশ কমতে পারে। বিনিয়োগ ব্যাংকটি এরই মধ্যে ইউরোজোনের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করে কমিয়ে এনেছে।
এসব কারণে সাবেক ইসিবি প্রেসিডেন্ট মারিও দ্রাঘি অঞ্চলটির নেতাদের দ্রুত কাঠামোগত সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন।
গত সেপ্টেম্বরে মারিও দ্রাঘির আলোচিত প্রতিবেদনটি সামনে আসে। তখন জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ যৌথ ঋণের সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাদের দৃঢ় বিরোধিতা চুক্তিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা অসম্ভব করে তোলে।
তবে অর্থায়ন সম্পর্কিত অন্য কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইইউ নেতারা। তারা হাতে থাকা কাঠামো ব্যবহারের ওপর জোর দেন। এর আওতায় ইইউর দীর্ঘমেয়াদি বাজেট, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) এবং পরিকল্পিত ক্যাপিটাল মার্কেটস ইউনিয়নের সর্বোচ্চ ব্যবহারের কথা বলা হয়। তারা বলেন, এর মাধ্যমে নতুন আর্থিক উপকরণের সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হবে। অবশ্য নতুন উপকরণ সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো ধারণা দেয়া হয়নি।
শীর্ষ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের কাছে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল স্বীকার করেন যে ইইউ দেশগুলোর জন্য ‘আর্থিক বিষয়ে ঐকমত্য’ সবসময় ‘কঠিন’। তবে বিতর্কিত ইস্যুগুলোয় সমঝোতা আসা সম্ভব। ২০২০ সালের ৭৫ হাজার কোটি ইউরো পুনরুদ্ধার তহবিলের আগে তীব্র আলোচনা তা প্রমাণ করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।